কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত ইসলামে অত্যন্ত মহান। এটি আল্লাহর নির্দেশ পালনের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জনের একটি ইবাদত। কুরবানির মাধ্যমে মানুষের তাকওয়া, ধৈর্য ও ত্যাগের মানসিকতা প্রকাশ পায়। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগের স্মরণে এই ইবাদত পালন করা হয়। এতে গরিব-দুঃখীদের সহায়তা করা যায় এবং সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। কুরবানির মাংস ভাগ করে দেওয়ার মাধ্যমে দানশীলতার শিক্ষা পাওয়া যায়। তাই এটি শুধু পশু জবাই নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত
ইসলামি শরিয়তে জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করাকে কুরবানি বলা হয়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে ইসলামের মৌলিক চেতনা তাকওয়া বা খোদাভীতি।
কুরবানির ইতিহাস মানবজাতির ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। তবে বর্তমান সময়ে আমরা যে কুরবানি করি, তা মূলত হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মারক। আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-কে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু অর্থাৎ তাঁর পুত্রকে কুরবানি করার স্বপ্ন দেখান। পিতা ও পুত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কঠিন পরীক্ষায় অটল থাকেন। ঠিক যখন ইব্রাহিম (আ.) ছুরি চালাচ্ছিলেন, তখন আল্লাহর কুদরতে সেখানে একটি দুম্বা প্রতিস্থাপিত হয় এবং ইসমাইল (আ.) রক্ষা পান। এই ত্যাগের মহিমা ধরে রাখতেই মুসলিম উম্মাহর ওপর কুরবানি ওয়াজিব করা হয়েছে।
কুরবানির গুরুত্ব
১. আল্লাহর আদেশ ও সুন্নতে ইব্রাহিম
কুরবানি করা সামর্থ্যবান মুসলিমদের ওপর আবশ্যক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
“অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন।” (সূরা কাউসার: ০২) এটি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং এটি একটি সুন্নাত যা পালনের মাধ্যমে মুমিনরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।
২. তাকওয়া বা খোদাভীতি প্রদর্শন
কুরবানির মূল লক্ষ্য হলো অন্তরের পবিত্রতা। আল্লাহ মানুষের পশুর রক্ত বা মাংস গ্রহণ করেন না, বরং তিনি দেখেন বান্দার নিয়ত। কুরআনে বলা হয়েছে:
“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না সেগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ: ৩৭)
৩. ত্যাগের মানসিকতা তৈরি
নিজের অর্জিত অর্থ দিয়ে কেনা প্রিয় পশুটি আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার মাধ্যমে মানুষের মনের ভেতরকার পশুত্ব ও কৃপণতা দূর হয়। এটি শেখায় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষ তার যেকোনো প্রিয় বস্তু ত্যাগ করতে প্রস্তুত।
কুরবানির ফজিলত ও সওয়াব
হাদিস শরিফে কুরবানির অসামান্য সওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
-
প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াব: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কুরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।” (ইবনে মাজাহ)। একটি পশুর শরীরে অগণিত পশম থাকে, যা কুরবানিদাতার জন্য বিপুল সওয়াবের কারণ হয়।
-
গুনাহ মাফ: পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই কুরবানিদাতার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক বিশেষ উপহার।
-
কিয়ামতের দিন নাজাতের মাধ্যম: রাসুল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন কুরবানির পশু তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে এবং এটি হবে মিজানের পাল্লায় এক ভারী আমল।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
ইসলামের প্রতিটি বিধানের মতো কুরবানিরও রয়েছে সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব:
-
দরিদ্রদের হক আদায়: কুরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব—এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ অভাবী মানুষের জন্য। এর ফলে বছরে অন্তত একবার সমাজের গরিব মানুষগুলো উন্নত মানের পুষ্টি তথা মাংস খাওয়ার সুযোগ পায়।
-
ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি: মাংস বিতরণের মাধ্যমে পাড়া-প্রতিবেশী এবং আত্মীয়দের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে। এটি সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করে।
-
অর্থনৈতিক গতিশীলতা: কুরবানিকে কেন্দ্র করে পশুপালন খাত, চামড়া শিল্প এবং হাট-বাজার কেন্দ্রিক এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এর ফলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয় এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
কোরবানির ফজিলত সম্পর্কে হাদিস
১. প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াব
কুরবানির পশুর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই সওয়াবের কারণ। এই মর্মে একটি বিখ্যাত হাদিস হলো:
জাইদ ইবনে আরকাম (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবীরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! এই কুরবানিগুলো কী?” তিনি বললেন, “এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।” তাঁরা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “এতে আমাদের জন্য কী (সওয়াব) রয়েছে?” তিনি বললেন, “প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি।” তাঁরা পুনরায় বললেন, “আর ভেড়া বা দুম্বার পশমে?” তিনি বললেন, “ভেড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকি রয়েছে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৭)
২. আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল
কুরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করা অর্থাৎ পশু জবেহ করা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি পছন্দের।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কুরবানির দিনে আদম সন্তানের আমলগুলোর মধ্যে পশু জবেহ করার চেয়ে অন্য কোনো আমল আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন কুরবানির পশুটি তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে। আর কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে কুরবানি করো।“ (তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৩)
৩. জান্নাতে যাতায়াতের সওয়ারি
অনেকে মনে করেন কুরবানির পশু হাশরের ময়দানে পারাপারে সাহায্য করবে। এই প্রসঙ্গে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে:
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের কুরবানির পশুগুলোকে মোটা-তাজা করো, কারণ এগুলো পুলসিরাত পার হওয়ার সময় তোমাদের সওয়ারি (বাহন) হবে।” (মুসনাদে আহমদ ও দাইলামি)
কুরবানির শিক্ষা
কুরবানি আমাদের শেখায় যে, জীবনের সব ক্ষেত্রেই আল্লাহর বিধানকে নিজের ইচ্ছা বা আবেগের ওপরে স্থান দিতে হবে। ইব্রাহিম (আ.) যেমন নিজের পুত্রকে আল্লাহর জন্য বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি, তেমনি একজন মুমিনকেও তার জীবন, সম্পদ ও সময় আল্লাহর পথে ব্যয় করতে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।
কুরবানি কেবল লোকদেখানো কোনো উৎসব নয়। যদি নিয়ত পরিষ্কার না থাকে এবং উপার্জিত অর্থ হালাল না হয়, তবে সেই কুরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। তাই লোকদেখানো মানসিকতা পরিহার করে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করা উচিত। এর মাধ্যমেই ব্যক্তিজীবন ও সমাজে ত্যাগের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।